টার্গেট কি শুভেন্দুই ছিলেন? মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রথ খুনের নেপথ্যে সুপারি কিলার ও গ্লক পিস্তলের ছায়া

টার্গেট কি শুভেন্দুই ছিলেন? মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রথ খুনের নেপথ্যে সুপারি কিলার ও গ্লক পিস্তলের ছায়া

কলকাতা, ৭ মে ২০২৬: রাজ্যে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের মাত্র ৫২ ঘণ্টা আগে বুধবার রাতে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম। দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ (৪২)। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

পুরোপুরি ফিল্মি কায়দায় ‘টার্গেট কিলিং’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ একটি সাদা রঙের স্করপিও গাড়িতে করে কলকাতা থেকে মধ্যমগ্রামের ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন বায়ুসেনার প্রাক্তন জওয়ান চন্দ্রনাথ। গাড়িটি দোলতলা ও মধ্যমগ্রাম চৌমাথার মাঝে দোহারিয়া এলাকায় পৌঁছলে দুষ্কৃতীরা সেটিকে ঘিরে ধরে।

  • ধাওয়ার ছক: শুভেন্দুর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারীর দাবি, অনেক আগে থেকেই শুটাররা চন্দ্রনাথের গাড়িটিকে ধাওয়া করছিল।
  • রাস্তা অবরোধ: একটি সন্দেহভাজন গাড়ি চন্দ্রনাথদের স্করপিওটির পথ আটকে দেয়, যার ফলে চালক বুদ্ধদেব বেরা গাড়ি থামাতে বাধ্য হন।
  • পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি: মুহূর্তের মধ্যে চারটি মোটরবাইকে থাকা অন্তত আট জন দুষ্কৃতী (যাদের মাথায় হেলমেট ছিল) পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলিবৃষ্টি শুরু করে। ৬ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান।
  • ঘাতক অস্ত্র: তদন্তকারীদের সন্দেহ, খুনের কাজে ‘গ্লক ৪৭এক্স’ (Glock 47X) পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। এই উন্নতমানের অস্ত্র সাধারণত পেশাদার সুপারি কিলাররাই ব্যবহার করে থাকে।

হাসপাতালের রিপোর্ট ও আহত চালক

চন্দ্রনাথ রথের বুকের বাঁ দিকে দুটি গুলি লাগে। হাসপাতালের কর্ণধার প্রতিম সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, তাঁকে মৃত অবস্থাতেই আনা হয়েছিল। অন্যদিকে, গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরার বুকে, পেটে ও হাতে তিনটি গুলি লেগেছে। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

বিজেপির অভিযোগ বনাম তৃণমূলের সিবিআই দাবি

এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মধ্যমগ্রামে পৌঁছান শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্যসহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

  • বিজেপির দাবি: শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি তৃণমূলকে দায়ী করে বলেন, “মাথায় গেরুয়া আবির লাগিয়ে তৃণমূলই তৃণমূলকে মারছে এবং শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গীকে খুন করল। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে?”
  • তৃণমূলের অবস্থান: তাৎপর্যপূর্ণভাবে, তৃণমূল কংগ্রেস এই খুনের নিন্দা জানিয়ে আদালতের নজরদারিতে সিবিআই (CBI) তদন্ত দাবি করেছে। একইসঙ্গে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের হাতে তাদের তিন কর্মী খুনেরও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে জোড়াফুল শিবির।

পুলিশি তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি

রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং সিআরপিএফ-এর ডিজি জ্ঞানেন্দ্র প্রতাপ সিং রাতেই ঘটনাস্থলে যান। ডিজি জানিয়েছেন, যে গাড়িটি দিয়ে পথ আটকানো হয়েছিল, সেটি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে গাড়ির নম্বর প্লেটটি ভুয়ো ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে আততায়ীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

ক্ষোভের আগুন মধ্যমগ্রামে

খুনের প্রতিবাদে উত্তেজিত বিজেপি সমর্থকরা যশোর রোড অবরোধ করেন এবং ডিজিপির গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখান। স্থানীয় প্রাক্তন মন্ত্রী রথীন ঘোষের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ চলে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

কে এই চন্দ্রনাথ রথ?

রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথ ২০০০ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। বায়ুসেনায় কাজ করার পর অবসর নিয়ে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক হিসেবে যোগ দেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দুর জয়ের নেপথ্যে যে নির্বাচনী ম্যানেজমেন্ট টিম ছিল, তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এই চন্দ্রনাথ।

প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *