ভারতে প্রথমবার উদ্ধার ১৮২ কোটির ‘জেহাদি ড্রাগ’, যেভাবে তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক আতঙ্ক! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
আন্তর্জাতিক মাদকচক্র এবং টেরর ফান্ডিং বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে ভারতের নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)। দেশের মাটিতে এই প্রথমবার উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ ‘কেপ্টাগন’ নামক এক মারাত্মক মাদক, যা বিশ্বজুড়ে ‘জেহাদি ড্রাগ’ নামে পরিচিত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত ‘অপারেশন রেজপিল’-এর মাধ্যমে এই বিশাল মাদকের চালানটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্ধারকৃত এই মাদকের আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ১৮২ কোটি টাকা। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক বিদেশি নাগরিককে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ মাদক মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য ছিল না। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীরা ভারতকে একটি সেফ ট্রানজিট রুট বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল। অনুমান করা হচ্ছে, এই মাদকের চালানটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মাদকমুক্ত ভারত’ অভিযানের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারতের মাটিতে মাদকপাচার কিংবা ভারতকে রুট হিসেবে ব্যবহার করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভয়ংকর কেপ্টাগন এবং ‘কিলিং মেশিন’ তৈরির রহস্য
চিকিৎসা ও রাসায়নিক পরিভাষায় কেপ্টাগন হলো এক ধরণের তীব্র উদ্দীপক ড্রাগ, যা মূলত অ্যামফিটামিন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই মাদকটি সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং নিমেষের মধ্যে নিষ্ক্রিয় করে দেয় স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। এটি সেবনের পর মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যার ফলে সেবনকারীর শরীরে অফুরন্ত শক্তি এবং এক ধরণের চরম উত্তেজনা বা ইউফোরিয়া তৈরি হয়।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন, বিশেষ করে সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় আইএসআইএস (ISIS)-এর মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই মাদকের ব্যাপক চল রয়েছে। কোনো বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা বা নৃশংস অভিযান চালানোর আগে জঙ্গিদের এই ড্রাগ খাওয়ানো হয়। মাদকটির প্রভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি লোপ পায় এবং সে এক অনুভূতিহীন হিংস্র যন্ত্র বা ‘কিলিং মেশিনে’ পরিণত হয়। এর ফলে দিনের পর দিন ঘুম, খিদে ও ক্লান্তি ছাড়াই উগ্রপন্থীরা লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। এমনকি মানব শরীরে ব্যথা, ভয় বা সহানুভূতির মতো মৌলিক আবেগগুলোকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে এটি জঙ্গিদের চরম নৃশংস ও বর্বর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে বাধ্য করে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ
এই মাদক কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় না, বরং আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এর চাহিদা আকাশছোঁয়া। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অর্থায়নে বা টেরর ফান্ডিংয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে এই কেপ্টাগন বাণিজ্য। উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো এই ড্রাগ চোরাচালানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এবং সেই অর্থ দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র কেনা ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ভারতের মাটিতে এই মাদকের উপস্থিতি দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই রুটটি যথাসময়ে বন্ধ না করা যেত, তবে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের অর্থায়নে ভারতের অজান্তেই এক বড় ধরণের ভূমিকা তৈরি হয়ে যেত, যা সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারত।
