ইরানের হাতে এমন কী অস্ত্র আছে যা আমেরিকা-ইজরায়েলের কাছে নেই? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
আধুনিক রণকৌশলে কেন আজও প্রাসঙ্গিক ২০০ বছর পুরোনো ক্লসউইৎজের যুদ্ধতত্ত্ব!
দুই শতাব্দী আগে প্রুশীয় সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লসউইৎজ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘অন ওয়ার’-এ যুদ্ধের যে রূপরেখা এঁকেছিলেন, তা আজও সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে সমানভাবে কার্যকর। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উত্তপ্ত অঞ্চল ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্লেষণ করতে গেলে ক্লসউইৎজের তত্ত্বগুলো যেন এক আয়নার মতো কাজ করে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে আজকের যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের দাপট থাকলেও যুদ্ধের মৌলিক চরিত্র যে অপরিবর্তিত, তা ক্লসউইৎজের দর্শনেই স্পষ্ট।
যুদ্ধের রাজনৈতিক দর্শন ও ক্লসউইৎজের ত্রিমাত্রিক তত্ত্ব
ক্লসউইৎজের সবচেয়ে প্রভাবশালী নীতি হলো, যুদ্ধ হলো অন্য কোনো উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ, সামরিক সংঘাত কেবল শক্তির মহড়া নয়, বরং এর পেছনে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকতে হয়। তাঁর মতে, একটি সফল যুদ্ধের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর—জনগণের আবেগ বা ঘৃণা, সামরিক সক্ষমতা বা সুযোগ এবং সরকারের সুচিন্তিত রাজনৈতিক লক্ষ্য। আধুনিক যুগের সংঘাতগুলোতে অনেক সময় দেখা যায়, উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দেশগুলো লক্ষ্যহীনভাবে জড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধের চক্রব্যূহে। বর্তমান সংকটে আমেরিকা বা ইসরায়েলের মতো পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধেও বিশ্লেষকরা প্রায়ই একই অভিযোগ তোলেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য বা ‘এন্ড গেম’ তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
রণকৌশল ও অনিশ্চয়তার সমীকরণ
ক্লসউইৎজের মতে যুদ্ধ অনেকটা গিরগিটির মতো, যা পরিস্থিতির প্রয়োজনে নিজের রঙ ও রূপ বদলে ফেলে। তাই যুদ্ধের শুরুতে নির্ধারিত লক্ষ্য বা পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত না-ও থাকতে পারে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বাতাবরণের অনিশ্চয়তা এই তত্ত্বকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। রণক্ষেত্রে কেবল অস্ত্রের জোরে জয়লাভ সম্ভব নয়, যদি না রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের লক্ষ্য ও কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন।
যুদ্ধের এই মৌলিক সত্যটিকে উপেক্ষা করলে যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদী সংকটে আটকা পড়তে পারে। আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ক্লসউইৎজের দর্শন এই বার্তাই দেয় যে, যুদ্ধের দামামা বাজানোর আগে যেকোনো দেশের নেতৃত্বের কাছে সংঘাতের শেষ গন্তব্য ও তার সুদূরপ্রসারী পরিণাম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অপরিহার্য। নতুবা, সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও কৌশলগত ব্যর্থতায় সেই যুদ্ধের কোনো সুফল অর্জন করা সম্ভব হয় না।
