গ্যাসের সংকট কাটবে না আগামী কয়েক বছর, সাধারণ মানুষের বিপদ কি তবে বাড়ল?

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি: দীর্ঘমেয়াদী এলপিজি সংকটের মুখে ভারত

বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রভাবে ভারত বড় ধরনের রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) সংকটের মুখে পড়তে চলেছে। সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে আগামী তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ভারতের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর একটি বিশাল অংশ যেহেতু পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরশীল, তাই এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকটের মূলে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা

ভারত এলপিজি আমদানির জন্য মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইরান ওই অঞ্চলের জ্বালানি পরিকাঠামোয় প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেট অফ হোরমুজ’ এলাকাটি ঘিরে সৃষ্টি হওয়া অস্থিরতার কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতের সরবরাহ ব্যবস্থা। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো পুনরায় চালু হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এটি কেবল সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আমদানির ওপর অতি-নির্ভরতা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

ভারতের এলপিজি বাজারের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতাই বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

  • বর্তমানে ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে।
  • যুদ্ধের আগে ভারতের এলপিজি আমদানির ৯০ শতাংশই আসত স্ট্রেট অফ হোরমুজ হয়ে। বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অস্থিরতার কারণে তা কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
  • বিকল্প পথের অনুসন্ধান চললেও তা পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় দুইই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দাম বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত ঘরোয়া সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১১৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের বার্ষিক এলপিজি চাহিদা প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন। বর্তমানে দেশে মাত্র ১৫ দিনের চাহিদার সমতুল্য মজুত ক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা এবং মজুত ক্ষমতার এই সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র শিল্পের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সরকারি পদক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরশাহী থেকে ৪১ শতাংশ এবং কাতার থেকে ২২ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে ভারত। ওই অঞ্চলে সংঘাতের ফলে জাহাজ ভাড়া এবং বিমার খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খুচরো বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পথে হাঁটছে:

  • আমদানির উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন নতুন দেশের সঙ্গে চুক্তি করা।
  • অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে গতি আনা।
  • অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবহারের ধরণ নিয়ন্ত্রণ করা।
  • অতিমারীর সময়ে কার্যকর করা বিকল্প সরবরাহ কৌশলগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা।

এক ঝলকে

  • সময়সীমা: আগামী ৩ থেকে ৪ বছর এলপিজি সংকটের আশঙ্কা।
  • মূল কারণ: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং স্ট্রেট অফ হোরমুজ অঞ্চলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া।
  • নির্ভরতা: ভারতের চাহিদার ৬০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে, যার বড় অংশ আরব দেশগুলো থেকে আমদানি হয়।
  • দাম বৃদ্ধি: ঘরোয়া সিলিন্ডারে ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ১১৫ টাকা দাম ইতিমধ্যেই বেড়েছে।
  • মজুত সংকট: দেশে মাত্র ১৫ দিনের এলপিজি মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
  • সরকারি উদ্যোগ: নতুন আমদানিকারক দেশ চিহ্নিতকরণ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিকল্প কৌশল গ্রহণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *