বাথরুমেই বোনের শেষকৃত্য! সাহায্যের আকুতিতেও সাড়া দিল না কেউ?

বাথরুমেই বোনের শেষকৃত্য! সাহায্যের আকুতিতেও সাড়া দিল না কেউ?

ঝাড়খণ্ডের ধনবাদে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা বর্তমানে গোটা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছে। আধুনিক জীবনযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম অবক্ষয় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এক ভয়াবহ দর্পণ এই ঘটনাটি। ধনবাদের গোবিন্দপুর এলাকার বাস্তু বিহার কলোনিতে এক ভাই নিজ দিদির মৃতদেহ পাঁচ দিন আগলে রাখার পর তা শৌচাগারে পোড়ানোর চেষ্টা করেছেন। মানবিকতা এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণের এই চরম ব্যর্থতা আমাদের সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পাঁচ দিন ধরে ঘরের ভেতর পচছিল নিথর দেহ

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, গত ৮ এপ্রিল ৩০ বছর বয়সী লিপিকা কুমারীর মৃত্যু হয়। এরপর টানা পাঁচ দিন তার ভাই প্রণব রাজবর্ধন মৃতদেহটির পাশেই ছিলেন। শোকাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে ওঠার আগেই তিনি প্রতিবেশীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন দিদির শেষকৃত্যের জন্য সাহায্যের আর্তনাদ নিয়ে। কিন্তু আইনি জটিলতার ভয়ে বা নিছক উদাসীনতায় কোনো প্রতিবেশীই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি। দীর্ঘ পাঁচ দিন মৃতদেহটি ঘরের ভেতরেই পড়ে ছিল, যা থেকে তৈরি হওয়া বিশ্রী দুর্গন্ধও কারো নজর কাড়েনি বা কেউ কৌতূহলী হয়নি।

অসহায়ত্ব থেকে চরম সিদ্ধান্ত

প্রতিবেশীদের এই প্রত্যাখ্যান এবং মানসিক বিপর্যস্তাবস্থায় গত ১২ এপ্রিল প্রণব বাড়ির শৌচাগারে একটি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দিদির দেহটি শৌচাগারে নিয়ে যান এবং ঘরোয়া জিনিসপত্র যেমন তোশক, বালিশ ও কাপড় স্তূপ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। যখন ঘর থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হতে থাকে, তখনই টনক নড়ে প্রতিবেশীদের। তারা পুলিশে খবর দেন এবং পুলিশ এসে অর্ধদগ্ধ দেহটি উদ্ধার করে।

তদন্তে উঠে আসছে মানসিক বিপর্যয়ের চিহ্ন

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই পরিবারটি অত্যন্ত একাকী জীবনযাপন করছিল। লিপিকার বাবা, যিনি বিজ্ঞানী ছিলেন, তিনি ২০২৩ সালে মারা যাওয়ার পর থেকেই ভাই-বোন দুজনেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তারা সমাজ থেকে নিজেদের কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। লিপিকার মৃত্যুটি স্বাভাবিক ছিল কি না বা এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ এখন ফরেনসিক রিপোর্ট এবং কল রেকর্ডের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে প্রণব পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

সামাজিক সংবেদনশীলতার সংকট

এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক ইস্যু নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। প্রতিবেশীদের মধ্যে যে মানবিক যোগাযোগ থাকার কথা, তা আজ বিলুপ্ত হতে বসেছে। কারো আর্তনাদ না শোনা বা একটি মৃতদেহ দিনের পর দিন অবহেলায় পড়ে থাকার ঘটনাটি আমাদের শহরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক জীবনের চরম উদাসীনতাকে নির্দেশ করে। ঠিক সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে মৃতদেহের প্রতি এই চরম আসাম্মান হয়তো আটকানো সম্ভব হতো।

এক ঝলকে

  • স্থান: ঝাড়খণ্ডের ধনবাদ, গোবিন্দপুর বাস্তু বিহার কলোনি।
  • ঘটনার প্রেক্ষাপট: ৮ এপ্রিল লিপিকা কুমারীর মৃত্যুর পর ৫ দিন মরদেহ বাড়িতেই ছিল।
  • হৃদয়বিদারক পদক্ষেপ: সাহায্যের অভাব ও মানসিক অবসাদে শৌচাগারে দেহ পোড়ানোর চেষ্টা করেন ভাই প্রণব।
  • বর্তমান পরিস্থিতি: পুলিশ দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে, ঘর সিল করা হয়েছে এবং ফরেনসিক তদন্ত চলছে।
  • মূল সংকট: প্রতিবেশীদের অসহযোগিতা এবং পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক একাকীত্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *