মেয়ে বড় হতেই বাবা হয়ে যান স্বামী! শৈশবে মেয়ের মতোই আদর, এই জনজাতির অদ্ভুত প্রথায় তাজ্জব সকলে

মেয়ে বড় হতেই বাবা হয়ে যান স্বামী! শৈশবে মেয়ের মতোই আদর, এই জনজাতির অদ্ভুত প্রথায় তাজ্জব সকলে

আদিবাসী সমাজে এক বিতর্কিত প্রথা: মা ও মেয়ের সঙ্গে একই ব্যক্তির বিবাহের নেপথ্য কাহিনী

আধুনিক সভ্যতার এই যুগে দাঁড়িয়েও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু প্রাচীন প্রথা টিকে রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে বসবাসকারী মান্ডি জনজাতির অন্দরে টিকে থাকা এমনই এক প্রথা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই জনজাতির কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে এমন এক রীতির প্রচলন রয়েছে, যেখানে একজন পুরুষ একই সঙ্গে মা ও মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। পিতৃত্ব ও দাম্পত্যের এই জটিল মেলবন্ধন সামাজিক কাঠামোর এক চরম বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

প্রথার নেপথ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ও সামাজিক যুক্তি

মান্ডি সমাজের বিধবা বিবাহ সংক্রান্ত নিয়ম থেকে এই প্রথাটি উদ্ভূত হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের রীতিনীতি অনুযায়ী, কোনো তরুণ যখন কোনো বিধবা নারীকে বিয়ে করেন, তখন পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ওই বিধবা নারীর যদি পূর্বের সংসারে কোনো কন্যা সন্তান থাকে, তবে ভবিষ্যতে তাকে ওই একই ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে।

সমাজের প্রবীণদের দাবি, এই প্রথার পেছনের কারণ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিবারের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সুরক্ষা এবং মা ও মেয়ের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার কথা ভেবেই সমাজ এই অদ্ভুত রীতির জন্ম দিয়েছে। তবে এই নিরাপত্তা কৌশলের আড়ালে মানবোচিত অধিকারের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়।

ওরোলা ও ভয়াবহ এক যন্ত্রণার বাস্তব চিত্র

এই প্রথার শিকার অসংখ্য নারীর মধ্যে ‘ওরোলা’ নামের এক নারীর অভিজ্ঞতা রীতিমতো শিহরণ জাগায়। তার ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর মা পুনরায় বিয়ে করেন। সৎ বাবা নটেন তাকে নিজ কন্যার মতোই লালন-পালন করেন। ওরোলা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং ‘বাবা’ বলেই সম্বোধন করতেন। কিন্তু যৌবনে পা রাখার পর ওরোলা জানতে পারেন, শৈশবেই তার অজান্তে নটেনের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল। ঠিক ওরোলা নয়, এমন আরও অনেকের শৈশবই এই প্রথার বলি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লেবেল লাগিয়ে চালানো এই প্রথা আসলে অনেক নারীর স্বপ্ন ও মানবাধিকারে বড় আঘাত।

আধুনিকতার ছোঁয়া ও পরিবর্তনের হাওয়া

যুগান্তকারী পরিবর্তনের এই সময়ে মান্ডি জনজাতির মধ্যেও এই প্রথা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। আধুনিক শিক্ষা ও বাইরের জগতের সাথে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের ফলে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম এখন এই রীতিকে আর সহজভাবে মেনে নিচ্ছে না। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকারবোধ তৈরি হওয়ার কারণে অনেকে এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মায়েরা এখন নিজেদের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিধবা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও একটি রক্ষণশীল গোষ্ঠী এখনো নিজেদের সামাজিক কাঠামো রক্ষায় এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তথাপি সময়ের সাথে সাথে এই অমানবিক রীতির গুরুত্ব মানুষের কাছে ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।

এক ঝলকে

  • বাংলাদেশের মান্ডি জনজাতির কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে মা ও মেয়েকে একই সাথে বিয়ে করার বিতর্কিত প্রথা এখনো বিদ্যমান।
  • নিয়ম অনুযায়ী, সৎ বাবাকেই বিধবা মায়ের পাশাপাশি কন্যা সন্তানকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে হয়।
  • পরিবার ও সম্পত্তির সুরক্ষাকেই এই প্রথার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দাবি করেন সমাজপতিরা।
  • ওরোলা নামক ভুক্তভোগীর জীবনকাহিনী এই প্রথার অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেছে।
  • আধুনিক শিক্ষা ও সচেতনতার ফলে প্রথাটি বর্তমানে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *