সব সময় সন্তানকে নিয়ে বড়াই করেন? বড় বিপদে ফেলছেন না তো!

সব সময় সন্তানকে নিয়ে বড়াই করেন? বড় বিপদে ফেলছেন না তো!

পিচক প্যারেন্টিং: সন্তানের সাফল্য কি কেবল অভিভাবকদের গৌরবের হাতিয়ার?

আধুনিক অভিভাবকত্বের এক নতুন ও বিতর্কিত ধারার নাম ‘পিচক প্যারেন্টিং’ (Peacock Parenting)। ময়ূর যেমন তার রঙিন পাখা মেলে নিজের সৌন্দর্য জাহির করে, তেমনই কিছু অভিভাবক তাদের সন্তানের প্রতিভা বা সাফল্যকে সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। আপাতদৃষ্টিতে একে গর্ব মনে হলেও, মনোবিদদের মতে এর পেছনে লুকিয়ে থাকে কঠোর মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মনোভাব।

পিচক প্যারেন্টিং আসলে কী?

যখন কোনো অভিভাবক তার সন্তানের অর্জনগুলোকে নিজেদের একক কৃতিত্ব হিসেবে প্রচার করেন, তখনই পিচক প্যারেন্টিংয়ের উদ্ভব ঘটে। সন্তানের সাফল্য এখানে আর কেবল সন্তানের নিজস্ব আনন্দের বিষয় থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের সামাজিক বা ব্যক্তিগত ‘ট্রফি’। স্কুলে ভালো ফল, খেলাধুলার বিজয় বা ছোট কোনো পারফরম্যান্স—সবকিছুই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক নিরন্তর চেষ্টা চলে।

সন্তানের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে

এই ধরনের প্যারেন্টিংয়ের ফলে শিশুরা অজান্তেই প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর ফলে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে:

  • আত্মমর্যাদাবোধের অভাব: সন্তান যদি মনে করে সে তখনই সমাদৃত হবে যখন সফল হবে, তবে তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি মার খেয়ে যায়।
  • উদ্বেগের সৃষ্টি: সবসময় সবার প্রত্যাশা পূরণের চাপে শিশুরা শৈশবকে উপভোগ করতে পারে না।
  • স্বাধীন চিন্তার অভাব: নিজের পছন্দের চেয়ে বাবা-মায়ের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে।
  • সম্পর্কের অবনতি: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের এই আচরণ সন্তানের মনে তিক্ততা তৈরি করে, যা পরবর্তী জীবনে পারিবারিক সর্ম্পককে প্রভাবিত করতে পারে।

কেন অভিভাবকদের এই প্রবণতা বাড়ছে?

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে অন্যের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করার প্রবণতা বেড়েছে। সন্তানকে একটি ‘পারফেক্ট’ ইমেজ বা ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার নেশায় অনেক অভিভাবক বুঝতে পারেন না যে, তারা অজান্তেই সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পরিবর্তে তাকে ব্যবহার করা বা তার অর্জনকে নিজের সম্মান বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে দেখা দীর্ঘমেয়াদে দুপক্ষের জন্যই ক্ষতিকর।

সচেতনতা ও উত্তরণের পথ

অভিভাবক হিসেবে সন্তানের সাফল্যে গর্ব বোধ করা স্বাভাবিক এবং কাম্য। তবে সেই গর্ব যেন সন্তানের ওপর বাড়তি ভার হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সন্তানের প্রতিভাকে অন্যের কাছে প্রদর্শনের চেয়ে বরং তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং তার আগ্রহের ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শিশু কোনো পণ্য বা প্রদর্শনী বস্তু নয়, বরং সে একটি স্বতন্ত্র মানুষ যার নিজস্ব স্বপ্ন ও লক্ষ্য রয়েছে।

এক ঝলকে

  • পিচক প্যারেন্টিং হলো সন্তানকে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।
  • এটি সন্তানের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে এবং মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে।
  • বাহ্যিক প্রশংসার চেয়ে সন্তানের অভ্যন্তরীণ বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় সন্তানের জীবনকে প্রদর্শনীতে পরিণত না করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
  • সুস্থ অভিভাবকত্ব মানে সন্তানের সাফল্যে গর্ব করা, কিন্তু তার মাধ্যম দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ না করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *