ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে কাটমানি এবং স্বজনপোষণের বিস্ফোরক অভিযোগে উত্তাল সংগীতজগৎ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
তৃণমূল সরকারের পতনের পর থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও নানা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এবার সরাসরি দুর্নীতির কাঠগড়ায় তোলা হলো রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিশিষ্ট গায়ক-নেতা ইন্দ্রনীল সেনকে। তাঁর বিরুদ্ধে ‘কাটমানি’ নেওয়া, ‘স্বজনপোষণ’ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘মঞ্চ বিক্রি’র মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনে সরব হয়েছেন রাজ্যের প্রথম সারির একাংশের শিল্পী ও ইভেন্ট ম্যানেজাররা। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক বয়ান দিচ্ছেন তাঁরা।
সংগীতজগতে কাটমানি ও সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চক্র
বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কাটমানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে জানিয়েছেন, সরকারি স্তরে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে রীতিমতো কমিশন নিতেন ইন্দ্রনীল সেন। তাঁর দাবি, কোনও অনুষ্ঠানে শিল্পী ৭ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেলে, সেখান থেকে ২ হাজার টাকাই কাটমানি হিসেবে প্রাক্তন মন্ত্রীকে দিয়ে দিতে হত। এখানেই শেষ নয়, এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি অবৈধভাবে সরকারি চাকরিও পেয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। একই সুরে সুর মিলিয়েছেন শিল্পী দোলা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ২০১৫ সালে ইন্দ্রনীল সেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই সংস্কৃতির সূচনা হয় দাবি করে তিনি জানান, শিক্ষা দুর্নীতির মতো এখানেও যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে মঞ্চ বিক্রি করা হত। এমনকি অনুষ্ঠানস্থলের সামনেই হাতে হাতে টাকা তোলার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
স্বজনপোষণ ও রবীন্দ্র সদন দখলের রাজনীতি
অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার। রাজ্য সংগীত অ্যাকাডেমি থেকে দু’বার সেরা নির্বাচিত হওয়া ‘এ’ গ্রেডপ্রাপ্ত চিকিৎসক-গায়ক উৎসব দাসের অভিযোগ, চরম যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বছরের পর বছর সরকারি অনুষ্ঠানে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল। মেলা বা উৎসবের সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে মাত্র ১০-১২ জন ঘনিষ্ঠ শিল্পীকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সুযোগ দেওয়া হত। অন্যদিকে, নামী সংগীত আয়োজক তোচন ঘোষ অভিযোগ করেছেন, বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্দ্রনীল সেনের পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টি করা হত। একটি নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে অন্যান্য শিল্পীদের মূল মঞ্চে গাইতে না দিয়ে বাইরের মাঠে পারফর্ম করতে বাধ্য করা হত।
পতনের প্রভাব ও তদন্তের দাবি
রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল হতেই সংস্কৃতির আঙিনায় তৈরি হওয়া এই ভয়ের পরিবেশ কাটতে শুরু করেছে। এতদিন কর্মহীন হয়ে পড়ার বা কোণঠাসা হওয়ার ভয়ে যাঁরা মুখ খুলতে পারেননি, প্রশাসন বদল হতেই তাঁরা সোচ্চার হয়েছেন। বঞ্চিত শিল্পীদের একাংশ এখন এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন এবং অভিযুক্ত ১০-১২ জন ঘনিষ্ঠ শিল্পীর ব্যাঙ্ক লেনদেন খতিয়ে দেখে নতুন সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনার জেরে রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মহলের দীর্ঘদিনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
