সাম্রাজ্যবাদের স্মৃতি মুছে লোকভবনে এবার ‘রাষ্ট্রবাদী বাংলার’ জয়গান! – এবেলা

সাম্রাজ্যবাদের স্মৃতি মুছে লোকভবনে এবার ‘রাষ্ট্রবাদী বাংলার’ জয়গান! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক বাসভবনে মুছে গেল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শেষ চিহ্ন। পূর্বতন রাজভবন, যা বর্তমানে ‘লোকভবন’ নামে পরিচিত, তার বিভিন্ন কক্ষ, হল, প্রবেশদ্বার, উদ্যান এবং রাস্তার নাম পরিবর্তন করে বাংলার মহান মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। রাজ্যপাল আর এন রবির অনুমোদনের পর এই সংক্রান্ত একটি সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূলত আধ্যাত্মিকতা ও রাষ্ট্রবাদের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে লোকভবনের অন্দরে।

গত সাত মাস আগে তৎকালীন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের কার্যকালে রাজভবনের নাম পরিবর্তন করে প্রথম ‘লোকভবন’ রাখা হয়েছিল। এবার সেই ধারাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে লোকভবনের ঔপনিবেশিক নামগুলোকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। রাজ্যপালের সচিব ড. সৌমিত্র মোহন স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট সমস্ত দপ্তরকে দ্রুত নতুন নাম অনুযায়ী ফলক ও সাইনবোর্ড বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও আমূল পরিবর্তনের কারণ

এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং সাম্রাজ্যবাদের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলে খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাষ্ট্রবাদী চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা। দীর্ঘকাল ধরে রাজকীয় এই ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্রিটিশ শাসকদের নাম ধারণ করে আসছিল, যা স্বাধীন ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল। সেই গ্লানি দূর করতেই এই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন রূপরেখা ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

নতুন এই নামকরণের তালিকায় বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকপালদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে। যেমন, পূর্বতন ‘প্রিন্স অব ওয়েলস স্যুইট’-এর নতুন নাম হয়েছে ‘গুরুদেব কক্ষ’, ‘ওয়েলেসলি স্যুইট’ হয়েছে ‘মাতঙ্গিনী কক্ষ’, এবং ‘ডাফরিন স্যুইট’-এর নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘হরিচাঁদ ঠাকুর কক্ষ’। একইভাবে, ঐতিহাসিক ‘থ্রোন রুম’ এখন থেকে ‘বন্দেমাতরম সভাঘর’ এবং ‘মার্বেল হল’-এর তিনটি অংশ যথাক্রমে পরমহংস, বিবেকানন্দ ও মা সারদার নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। লোকভবনের রাজকীয় প্রবেশদ্বারগুলোর নামও বদলে কবিগুরু দ্বার, ঋষি বঙ্কিম দ্বার, ক্ষুদিরাম বসু দ্বার এবং সিধু-কানু দ্বার করা হয়েছে। এমনকি রাজভবনের গ্রন্থাগারের নাম হয়েছে ‘বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগার’ এবং রাজ্যপালের অফিস কক্ষটির নাম রাখা হয়েছে ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কক্ষ’।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে রাজ্যের সর্বোচ্চ ঐতিহ্যবাহী ভবনের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক আবহে এক বড়সড় পরিবর্তন আসবে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলার প্রকৃত ইতিহাস, বীরত্ব এবং মনীষীদের অবদানকে তুলে ধরতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঔপনিবেশিক দাসত্বের প্রতীকগুলো সরিয়ে জাতীয়তাবোধের এই বিকাশ দীর্ঘমেয়াদে বাঙালি জনমানসে স্বাধিকার ও গৌরবের চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *