তেল সংকটেও ভারতের অর্থনীতি কি অজেয়?

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ভারতের অর্থনীতির চাকা সচল থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি (S&P) গ্লোবাল রেটিংস। পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও দেশটির শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি যেকোনো ধরনের ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম বলে মনে করছে সংস্থাটি।
তেলের দাম ও প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বাড়লে ভারতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসঅ্যান্ডপি-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলারে পৌঁছায়, তবে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০.৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এমনকি ২০২৭ সালেও তেলের দাম ১০০ ডলারের আশেপাশে স্থির থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কর্পোরেট ও ব্যাংকিং খাতের ওপর প্রভাব
তেল সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশের বৃহৎ শিল্প ও আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়বে। এর প্রধান দিকগুলো হলো:
- মুনাফায় টান: কাঁচামালের দাম বাড়লে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করপোরেট কো ম্পা নিগুলোর আয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- ঋণের বোঝা: উৎপাদন খরচ সামাল দিতে গিয়ে কো ম্পা নিগুলোর ঋণের পরিমাণ ০.৫ থেকে ১ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
- ব্যাংকিং খাতের স্থিতিস্থাপকতা: শিল্প খাতের দুরবস্থার ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (NPA) হার ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে বর্তমানে ব্যাংকগুলোর হাতে শক্তিশালী মূলধন রিজার্ভ থাকায় এই ধাক্কা সামলানোর পর্যাপ্ত সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
প্রতিরোধ সক্ষমতার মূল কারণসমূহ
ভারতের অর্থনীতির বর্তমান কাঠামো বেশ মজবুত। এর পেছনে বেশ কিছু ইতিবাচক কারণ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত কয়েক বছরে কর্পোরেট খাতের ঋণের বোঝা আগের তুলনায় কমেছে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। এই মজবুত অর্থনৈতিক বর্মই যেকোনো স্বল্পমেয়াদী বৈশ্বিক সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করবে।
ঝুঁকিতে থাকা খাত ও সরকারি প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে রাসায়নিক, তেল পরিশোধন এবং বিমান চলাচল শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, পরিকাঠামো ও জনসেবামূলক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। তবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যদি ভর্তুকি প্রদান বাড়ায়, তবে সরকারি কোষাগারে বা রাজস্ব খাতে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া রুপির বিনিময় হারের ওপরও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস মনে করছে, বর্তমান ভঙ্গুর বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতের নিজস্ব আর্থিক শক্তি বড় ধরনের বিপর্যয় রুখতে যথেষ্ট।
এক ঝলকে
- তেলের দাম: ২০২৬ সালে ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
- জিডিপি প্রভাব: প্রবৃদ্ধি ০.৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
- ব্যাংকিং সেক্টর: খেলাপি ঋণ ৩.৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যাংকগুলো সুরক্ষিত।
- সুরক্ষা কবচ: দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং উন্নত কর্পোরেট আর্থিক অবস্থা।
- ক্ষতিগ্রস্ত খাত: বিমান চলাচল, রাসায়নিক এবং তেল শোধনাগার শিল্প বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
