কমছে প্রফিট মার্জিন, বাজারে জাল ওষুধের রমরমা রুখবে কে – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
ওষুধ ব্যবসার দুনিয়ায় এখন এক চরম সংকটকাল চলছে। একদিকে যেমন জীবনদায়ী ওষুধের কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম, অন্যদিকে তেমনই খুচরো বাজারে প্রফিট মার্জিন বা লাভের অঙ্ক ক্রমশ কমে আসা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি ন্যায্যমূল্যের দোকান এবং জনঔষধির মতো বিকল্প ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে সাধারণ রিটেলার বা ওষুধ বিক্রেতাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার জোগাড়। দোকান ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন মিটিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই যেখানে দায়, সেখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ঝুঁকছেন ‘জাল’ ওষুধের ব্যবসার দিকে। সম্প্রতি কলকাতার কলুটোলা স্ট্রিট-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জাল ওষুধ ও নকল চিকিৎসা সরঞ্জাম উদ্ধার এই আশঙ্কাজনক বাস্তবকে লেন্সের তলায় এনেছে।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও জেনেরিকের জটিল রসায়ন
ওষুধের দাম বাড়ার প্রধানতম কারণ হলো এর মূল উপাদানের বা কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি। ভারতে উৎপাদিত ওষুধের এক বিপুল অংশের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে জাহাজের ভাড়ার পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামজাত প্যাকেজিং সামগ্রীর খরচও বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ওষুধের মূল্যের ওপর। পেটেন্ট-মুক্ত হওয়ার পর ভারতের বাজারে সস্তা ‘জেনেরিক’ ওষুধের রমরমা শুরু হলেও, সব ক্ষেত্রে সেগুলির গুণমান বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন রয়েছে। রফতানিযোগ্য জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে যে কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্ষেত্রে সেই গুণমানে অনেক সময়ই আপস করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
অস্তিত্বের লড়াই বনাম অসাধু সিন্ডিকেট
ওষুধের খুচরো ব্যবসায়ীদের লাভ কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। নামী সংস্থার ওষুধের খালি খাপ বা শিশি সংগ্রহ করে তার মধ্যে চক বা ধুলোমাটি মিশিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় কম দামে বিক্রি করার মতো হাড়হিম করা ঘটনাও ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু লোকদেখানো অভিযান বা ‘রেড’ হলেও, মূল মাথা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এমনকি সরকারি স্তরে পাইকারি ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বড় রকমের দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে বারবার।
প্রতিকার ও সচেতনতার অভাব
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সরকার জনঔষধি কেন্দ্র বাড়ানো এবং ওষুধের প্যাকেজে কিউআর কোড (QR-Code) ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের বড় অংশই জিএসটি ফাঁকি দিয়ে সস্তায় ওষুধ কেনার চক্করে ক্যাশ মেমো নিতে চান না, যা পরোক্ষে জাল ওষুধের ব্যবসাকেই সুবিধা করে দিচ্ছে। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও ওষুধের বাণিজ্যিক নামের পরিবর্তে মূল উপাদানের নাম (Composition) লেখার নিয়ম চালু হলেও তা কড়া নজরদারির অভাবে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ডাক্তারদের বদলে এখন ব্র্যান্ড নির্ধারণের ক্ষমতা চলে যাচ্ছে দোকানদারদের হাতে, যা পরোক্ষভাবে অনৈতিক বিপণনকেই উৎসাহিত করছে। এই চক্রব্যূহ থেকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে মুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
